Wednesday, October 21, 2026
Homeঅন্যান্যভ্রমণজাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে হোমস্টে, জেনে নিন বিস্তারিত

জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে হোমস্টে, জেনে নিন বিস্তারিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : এক পাশে উঁচু পাহাড় আর ঝরনার মিতালি। সমতলে বয়ে গেছে স্বচ্ছ জলের পাথুরে পিয়াইন নদ। সিলেটের পিয়াইন নদ পেরোলে দেখা মিলবে খাসিয়া জনগোষ্ঠীদের জীবন। খাসিয়াদের বাড়িতে রাত যাপন করে তাঁদের জীবন-জীবিকা, খাওয়াদাওয়া আর সংস্কৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা গ্রহণের সুযোগও চালু হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে জাফলংয়ের খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে ‘কমিউনিটি ট্যুরিজম’। বর্তমানে তিনটি পুঞ্জি বা পাড়ায় চারটি হোমস্টেতে অন্তত ১৫ জন পর্যটক রাত যাপন করতে পারবেন।
জাফলং জিরো পয়েন্টের বল্লার ঘাটে গাইডরা স্বাগত জানায়। তাঁরা খাসিয়া সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী। পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করছেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পিয়াইন নদ পার হওয়া। ঘাটের ওপার থেকে খাসিয়া কমিউনিটি মিশন। এটি মূলত স্থানীয় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়। এই চত্বরের পাশে দুটি কক্ষ নিয়ে একটি হোমস্টে চালু।
আরেকটু পথ এগোলেই একে একে নকশিয়াপুঞ্জি আর লামাপুঞ্জির দেখা মিলে। খাসিয়া সম্প্রদায়ের একেকটি পাড়া বা মহল্লাকে পুঞ্জি বলা হয়। এক পুঞ্জি থেকে আরেক পুঞ্জিতে যেতে পথের দুই ধারে সুপারি আর পানের বরজের দৃশ্য চোখে পড়বে। পুঞ্জিগুলোয় খাসিয়াদের বাড়িগুলো যেন ছবির মতো সাজানো। মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে মাঁচার ওপর দাড়িয়ে আছে একেকটি বাড়ি। কোনোটি বাঁশের তৈরি আবার কোনোটি পাকা বাড়ি। প্রতিটি বাড়ি ও উঠান একদম ঝকঝকে পরিষ্কার। গাইড সেভেনলী খংস্তিয়া জানান, খাসিয়ারা স্বভাবগতভাবেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করেন। আর প্রাচীনকালে জীবজন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাচার মতো উঁচু করে বাড়ি বানাতেন খাসিয়ারা। এখন সেই ভয় না থাকলেও উঁচু করে বাড়ি বানানোর প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাঁরা।
নকশিয়াপুঞ্জির পুঞ্জির হেডম্যান বা প্রধান ওয়েলকাম লাম্বা। তাঁরা দুই ভাই মিলে দুটি হোমস্টে চালু করেছেন। ওয়েলকাম লাম্বা বলেন, ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে তাঁদের ধারণা বদলে গেছে। এখন তাঁদের বাড়তি আয়ের সুযোগ হচ্ছে। নিজেদের বাড়ির পড়ে থাকা দুটি কক্ষ তাঁরা ছিমছাম করে সাজিয়েছেন। শৌচাগার কিছুটা উন্নত করেছেন। সেখানেই এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এসে থাকছেন।
মধ্যাহ্নভোজন রমলা রেস্টুরেন্ট নামের একটি কমিউনিটি রেস্টুরেন্টে। এখানে দেশি খাবারের পাশাপাশি খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, যেমন বিন্নি চালের পোলাও, ডকলে (চিকেন সালাদ), বাঁশকোঁড়ল, কাঁঠাল-শুঁটকির তরকারি, সরওয়া (স্যুপ), চিকেন ভুনা ইত্যাদির স্বাদও নিতে পারবেন। এখানে প্রতিবেলা খেতে খরচ পড়বে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারাই এই রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করেন।
খাওয়া শেষে সিলেট অঞ্চলের বৃহত্তম সমতল ভূমির চা–বাগান হিসেবে খ্যাত জাফলং চা–বাগান ঘুরে দেখতে পারেন। এরপর একে একে সাইকেল ট্র্যাকিং এরিয়া আর লামাপুঞ্জির সেলফি জোন। পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন ডুবতে বসে, তখন লামাপুঞ্জি আলোকিত করে দেয় একদল খাসিয়া শিশু। খাসিয়া ভাষার গানের তালে তালে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে পর্যটকদের উদ্দেশে নৃত্য পরিবেশন করে শিশুরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর সন্ধ্যায় ঘুরে দেখা কমিউনিটি মিউজিয়াম। যেখানে খাসিয়াদের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, প্রাচীনকালের কৃষিকাজের ব্যবহৃত সামগ্রী, যুদ্ধের অস্ত্রের আদলে তৈরি মিনিয়েচার প্রদর্শন করা হয়।
পরদিন সকালে একজন খাসিয়া পানচাষির সঙ্গে দেখতে পারেন পানপাতা সংগ্রহের প্রক্রিয়া। পানপাতা খাসিয়াদের কাছে পবিত্র একটি পাতা। তাই প্রতিদিন সকালে গোসল করে পবিত্র অবস্থায় পানচাষিরা এ কাজ করেন। পানবরজের ভেতরেই রয়েছে সুপারি আর দেশি কমলার গাছ। মূলত পান আর সুপারি খাসিয়াদের প্রধান আয়ের উৎস। তবে প্রথাগত এই কাজের পাশাপাশি পর্যটনের মাধ্যমেও দিনবদলের স্বপ্ন দেখছে জাফলংয়ের এই খাসিয়া জনপদ।
খাসিয়াদের মধ্যে অনেকেই এখন নিজেদের বাড়িতে হোমস্টে সুবিধা চালুর ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। নতুন ধারার এ পর্যটন চালুর পর কক্ষভাড়ার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা যেমন আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন, একইভাবে স্থানীয় অটোরিকশাচালক, দোকানি, ট্যুর গাইড—সবাই পর্যটনের মাধ্যমে বাড়তি আয় করতে পারছেন।
বর্তমানে রাতযাপনের ব্যবস্থাটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ভ্রমণের আগে ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে রাতযাপনের অনুমতি নিতে হবে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments